কোন ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয় এবংপ্রতিকার কি

 খাদ্য তালিকায় পুষ্টি জনিত খাবার দরকার 

স্কার্ভি একটি পুষ্টি জনিত রোগ, যা ভিটামিন সি(অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) এর গুরুতর অভাবের কারণে হয়। মানুষের শরীরে নিজে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না, তাই এটি খাদ্য থেকে গ্রহণ করতে হয়। দীর্ঘদিন (সাধারণত ১-৩ মাস) ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার না খেলে এই রোগ দেখা দেয়।

আর ভিটামিন সি যুক্ত খাবার না খেলে শরীরে এর মাত্রা কমে যায়, যা কোলাজেন নামক প্রোটিনের সংশ্লেষণে বাধা দেয়। কলেজের রক্তনালী, মাড়ি, ত্বক ও হাড়ের জন্য অপরিহার্য। ফলে রক্তক্ষরণ, দুর্বলতা এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। আধুনিক যুগে এই রোগ বিরল, কিন্তু অপুষ্টি, দারিদ্র, অ্যালকোহল আসক্তি বা কিছু চিকিৎসা জনিত কারণে এখনও কিছু মানুষ আক্রান্ত হয়।

পোস্ট সূচীপত্রঃ কোন ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয় 
  • ভিটামিন সি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ যে তার অভাবে স্কার্ভি হয়
  • স্কার্ভির ঐতিহাসিক পটভূমি
  • স্কার্ভি রোগের লক্ষণ সমূহ
  • স্কার্ভি রোগের কারণসমূহ
  • চিকিৎসা
  • প্রতিরোধ
  • সর্তকতা
  • শেষ কথা

কোন ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয়

ভিটামিন সি এর অভাবে স্কার্ভি( ইংরেজি:Scurvy) রোগ হয়, ভিটামিন সি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জল-দ্রবীভূত ভিটামিন, যা শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং অনেক শারীরিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দৈনিক চাহিদা ৫৭-৯০ মিলিগ্রাম(তবে ধূমপায়ীদের জন্য বেশি)।

ভিটামিন সি-যুক্ত খাবারের তালিকা(প্রতি ১০০ গ্রামে মিলিগ্রাম):

  • স্ট্রবেরি:৫৯ মিলিগ্রাম
  • পেয়ারা:২২৮ মিলিগ্রাম
  • কিউই:৯৩ মিলিগ্রাম
  • কমলা:৫৩ মিলিগ্রাম
  • লেবু:৫৩ মিলিগ্রাম
  • পেঁপে:৬২ মিলিগ্রাম
  • ব্রকলি:৮৯ মিলিগ্রাম
  • টমেটো:২৩ মিলিগ্রাম
  • আমলকি:৬১০.০০মিলিগ্রাম
  • মরিচ:১৪৪.০০মিলিগ্রাম
  • পার্সলি:১৩৩.০০মিলিগ্রাম
  • বেল মরিচ:৮০.৪০মিলিগ্রাম
  • সবুজ কিউয়ি ফল:৯২.৭০মিলিগ্রাম
  • বিছুটি:৩৩৩.০০মিলিগ্রাম
  • জেসপ্রি সানগোল্ড:১৬১.৩০মিলিগ্রাম

ভিটামিন সি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ যে তার অভাবে স্কার্ভি হয়

১.কোলাজেন তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা: ভিটামিন সি কোলাজেন প্রোটিনের সংশ্লেষণে(synthesis) একটি কো- ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। কোলাজেন শরীরের সংযোজন টিস্যু(connective tissue)- এর প্রধান উপাদান-যা ত্বক, রক্তনালী, মাড়ি,হাড়,কার্টিলেজ,টেন্ডন ইত্যাদিকে শক্তিশালি ও স্থিতিস্থাপক রাখে।
২. কিভাবে অভাবে সমস্যা হয়: ভিটামিন সি না থাকলে কোলাজেনের হাইড্রক্সিলেশন প্রক্রিয়া(prolineও lysine অ্যামিনো অ্যাসিডের হাইড্রক্সিলেশন) ব্যবহৃত হয়। ফলে কোলাজেন দুর্বল ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে:
  • ছোট রক্তনালিগুলো(capillaries) ভঙ্গুর হয়ে যায়-সহজে রক্তপাত(বিশেষ করে মাড়ি, ত্বকের নিচে)।
  • হাড় ও দাঁতের গোড়া দুর্বল হয়।
  • ক্ষত সারতে পারে না।
  • পুরনো ক্ষত আবার ফুলে যায়
কেন শুধু ভিটামিন সি-এর অভাবেই এই রোগ হয়?
  • মানুষ, কিছু প্রাইমেট(বানর),গিনিপিগ এবং কয়েকটি প্রাণী নিজে থেকে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না(অন্যান্য বেশিরভাগ প্রাণী লিভারে GULO এনজাইমের মাধ্যমে গ্লুকোজ থেকে ভিটামিন সি তৈরি করে)।
  • তাই মানুষের জন্য ভিটামিন সি একটি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান(essential nutrient)-যা শুধু খাদ্য থাকে পেতে হয়।
  • অন্য ভিটামিনের অভাবে ভিন্ন ভিন্ন রোগ হয়, (যেমন-ভিটামিন ডি-র অভাবে রিকেটস, ভিটামিন বি১-এর অভাবে বেরিবেরি), কিন্তু স্কার্ভির মত নির্দিষ্ট লক্ষণসমূহ শুধু ভিটামিন সি-এর অভাবেই দেখা যায়।
কতদিন অভাব থাকলে স্কার্ভি হয়?
  • শরীরে ভিটামিন সি-র রিজার্ভ খুবই কম(প্রায় ১৫০০-২০০০ মিলিগ্রাম)।
  • সম্পূর্ণ ভিটামিন সি-বিহীন খাদ্য খেলে-১-৩ মাসের মধ্যে প্রথম লক্ষণ(ক্লান্তি, দুর্বলতা)।
  • ৩-৬ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ স্কার্ভি (রক্তপাত, দাঁত পড়ে যাওয়া
  • দৈনিক চাহিদার চেয়ে অনেক কম(১০ মিলিগ্রামের নিচে) পেলেও ধীরে ধীরে অভাব দেখা দেয়।

স্কার্ভির ঐতিহাসিক পটভূমি

স্কার্ভি মানব ইতিহাসের একটি কুখ্যাত রোগ। প্রাচীনকাল থেকে এটি পরিচিত ছিল। মিশরীয় প্যাপিরাসে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০) এর উল্লেখ আছে। কিন্তু এটি বিশেষভাবে কুখ্যাত হয়ে ওঠে নাবিকদের মধ্যে। ১৫শ- ১৮শ শতাব্দীতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় তাজা ফল-সবজি না পাওয়ায় হাজার হাজার নাবিক মারা যেত স্কার্ভিতে। উদাহরণস্বরূপ ভাস্কো দা গামা যাত্রায় তার ক্র- এর অর্ধেকের বেশি মারা যায় এই রোগে। যেসব নাবিকরা স্কার্ভি ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হতো তাদেরকে সেন্ট হেলেনা দিপে রেখে যেত।

সুস্থ হলে পরবর্তী জাহাজে তারা বাড়ি ফিরত।১৫০০সালে,ক্যাব্রালে ভারতগামী নৌবহরের একজন নাবিক লিখেছিলেন যে, মালিন্দির রাজা অভিযাত্রিক দলকে সতেজ মেষমাংস, মুরগির মাংস, পাতি হাঁস ওএর সাথে লেবু ও কমলা দিয়েছিলেন যার ফলে আমাদের কয়েকজনের স্কার্ভি ভালো হয়েছিল।১৫৩৬সালে ফরাসি ভ্রমণকারী জাক কার্তিয়ে সেন্ট লরেন্স নদী ভ্রমণের সময় তার স্কার্ভি আক্রান্ত লোকদের সারিয়ে তোলার জন্য স্থানীয় লোকজনের জ্ঞান কাজে লাগিয়েছিলেন।

জোনাথান ল্যাম্ব লিখেছিলেন, ১৪৯৯ সালে ভাস্কোদাগামা তার ১৭০ জন নাবিকদের মধ্যে ১১৬ জনকে হারিয়েছিলেন, ১৫২০ সালে ম্যাগেলান ২৩০ জনের মধ্যে ২০৮ জনকে হারান, সবাই মূলত স্কার্ভিতে মারা যায়।১৫৯৩সালে অ্যাডমিরাল স্যার রিচার্ড হকিন্স স্কার্ভি প্রতিরোধের জন্য কমলা ও লেবুর রস খাওয়ার কথা বলেছিলেন।১৬১৪সালে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জন জেনারেল জন উইডল কোম্পানির জাহাজের শিক্ষানবিশ শল্যচিকিৎসকদের জন্য দা সার্জনস মেট নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন।

১৭৪৭ সালে স্কটিশ চিকিৎসক জেমস লিন্ড প্রথম নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করে প্রমাণ করেন যে, লেবু ও কমলার রস খেলে স্কার্ভি রোগ সেরে যায়।১৮০০সালের মধ্যে স্কটল্যান্ডে স্কার্ভি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় যেখানে পূর্বে ব্যাপকভাবে এই রোগটা ছড়িয়ে ছিল। এটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাইলফলক। পরবর্তীতে ব্রিটিশ নৌবাহিনী লেবুর রস বাধ্যতামূলক করে, যার ফলে নাবিকদের"লাইমি"(Limey) বলা হত।

স্কার্ভি রোগের লক্ষণ সমূহ

স্কার্ভির লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দেয়।প্রথম ১-৩মাসে প্রাথমিক লক্ষণ: যেমন-
  • দুর্বলতা,অত্যধিক ক্লান্তি, ক্ষিদে কমে যাওয়া
  • মাড়ি ফুলে যাওয়া,লালচে-বেগুনি হয়ে মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া
  • হাত-পায়ে ব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা,কারনিটিন উৎপাদন কমে যাওয়ার জন্য পেশিব্যথা হতে পারে।
অন্যান্য লক্ষণ: যেমন-
  • চুল কুঞ্চিত হয়ে যাওয়া
  • দাঁত আলগা হয়ে যাওয়া বা পড়ে যাওয়া, ক্ষত নিরাময়ে বিলম্ব হওয়া বা আবেগীয় পরিবর্তন(যেটা কোন শারীরিক পরিবর্তন ঘটার পূর্বেই দেখা দিতে পারে)
  • শৌগ্রেন সিনড্রোম এর মত চোখও মুখ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে জন্ডিস, সর্বশরীররে স্ফীতি,প্রস্রাব কমে যাওয়া(অলিগিউরিয়া),স্নায়ুরোগ,জর,খিঁচুনি ও এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
  • ত্বকেরক্তক্ষরণ,(পেরিফলিকুলার হেমারেজ) ক্ষতসারতে দেরি,(চুলের গোড়ায়ছোট রক্তক্ষরণ),পিটিকিয়া(ছোট লালদাগ), ত্বক খসখসে হয়ে যাওয়া, সহজে কাল শিরা পড়া
  • রক্তস্বল্পতা(অ্যানিমিয়া),শ্বাসকষ্ট , হৃদ যন্ত্রের সমস্যা 
  • শিশুদের ক্ষেত্রে হাড়ের ব্যথা, পায়ে ফোলা, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
  • গুরুতর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রক্তপাত, সংক্রমণ বা মৃত্যু হতে পারে

রোগের কারন সমূহ

মানুষ বিপাকীয়ভাবে ভিটামিন সি সংশ্লেষণে অক্ষম, তাই খাদ্যে ভিটামিন সি এর অভাব হলে স্কার্ভি রোগ হয়। যদিও শিশু ও বৃদ্ধারা আক্রান্ত হয়, বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য সকল শিশু খাদ্যে ভিটামিন সি যোগ করা থাকে যা শিশুদের স্কার্ভি প্রতিরোধে সহায়তা করে। মা যদি পর্যাপ্ত ভিটামিন সি খায়, তাহলে মানব স্তন দুগ্ধে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে। তবে আধুনিক পশ্চিমা সমাজে বয়স্কদের ক্ষেত্রে স্কার্ভি বিরল।

বাণিজ্যিক দুধ পাস্তুরিত করা হয়, ফলে উচ্চতাপে প্রাকৃতিক ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়। স্কার্ভি অপুষ্টিজনিত রোগ গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। এরূপ অনুপুষ্টি ঘাটতির অন্যান্য রোগ গুলো হল বেরিবেরি ও পেলাগ্রা। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে যে সকল ব্যক্তি সুষম খাদ্যাভাস গড়ে তুলেনি তাদের মধ্যে এখনও স্কার্ভি রোগ দেখা যায়। পৃথিবীর যে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে এখনো বাহ্যিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল সেসব অঞ্চলে স্কার্ভি রোগ বিদ্যমান।

১৫-১৮ শতকে সমুদ্রযাত্রীদের মধ্যে স্কার্ভি মহামারি আকারে দেখা দিত কারণ জাহাজে মাসের পর মাস শুধু শুকনো বিস্কুট, লবণাক্ত মাংস ও পানি থাকতো- কোন তাজা ফল-সবজি ছিল না।১৭৫৩ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক জেমস লিন্ড প্রথম প্রমাণ করেন যে, লেবু-কমলা রস খাওয়ালে সার্ভিস সেরে যায়, পরবর্তীকালে ভিটামিন সি-র কার্যকারিতা প্রমাণ করে।এবং ১৯৩২ সালে ভিটামিন সি আবিষ্কারের পর নিশ্চিত হয় যে, এটিই স্কার্ভির একমাত্র কারণ।

 চিকিৎসা

১৭০৭সালে গ্লস্টারশায়ারের হ্যাসফিল্ডের একটি বাড়িতে জনাবা এবট মিচেলের একটি হস্তলিখিত বই আবিষ্কৃত হয় যেখানে স্কার্ভি থেকে পরিত্রাণের ওষুধের কথা লিখা ছিল যা ছিল কমলার রস ও সাদা ওয়াইন বা বিয়ারের সাথে মিশ্রিত বিভিন্ন উদ্ভিদের নির্যাস।১৭৩৪ সালে লেইডেন ভিত্তিক চিকিৎসক জোহান ব্যাকস্ট্রম স্কার্ভির ওপর একটি বই প্রকাশ করেন যাতে তিনি উব্দৃত করেন যে স্কার্ভি হয় কেবল সবুজ সতেজ খাদ্য খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকলে, যা এই রোগের একমাত্র মুখ্য কারণ।

আরোগ্য লাভের জন্য সবুজ-সতেজ শাকসবজিও ফল খাওয়ার অনুরোধ জানান।১৭৪৭ সালের দিকে জেমস লিন্ড আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে খাবারের সাথে লেবু জাতীয় ফল যোগ করে স্কার্ভির চিকিৎসা করা সম্ভব। এটা ছিল মেডিসিনের ইতিহাসে প্রথম নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা গবেষণা প্রতিবেদন। এইচ এম এস সালিসবারিতে নৌবাহিনীর সার্জন হিসেবে লিন্ড স্কার্ভির  সুপারিসকৃত প্রতিকার কে তুলনা করে পরীক্ষা চালান।

এর মধ্যে ছিল হার্ড সাইডার,ভিট্রিওল,ভিনেগার, কমলালেবু, সামুদ্রিক পানি এবং পেরুর গন্ধতরু,আদা, সরিষা বীজ ও মুলার মূলের মিশ্রণ।আট্রিটিজ অন দা স্কার্ভি নামক প্রবন্ধে লিন্ড তার গবেষণার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, চিকিৎসায় কমলা ও লেবু সবচেয়ে কার্যকর।১৭৪০-১৭৪৪সালে জর্জ অ্যানসনের সমুদ্রাভিযানে প্রথম দশ মাসের মধ্যে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ(২০০০জনের মধ্যে১৩০০জন) নাবিক স্কার্ভিতে মারা যায়।

 সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে রয়্যাল নেভী ১৮৪৮৯৯ জন সৈনিকের তালিকা তৈরি করেছিলেন,যার মধ্যে ১৩৩৭০৮ জনেরই খোঁজ মিলেনি বা  রোগে মারা গিয়েছে। স্কার্ভি ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। ১৭৬৪ সালে সেনাবাহিনীর সার্জন জেনারেল ও পরবর্তীতে রয়েল সোসাইটির সভাপতি স্যার জন প্রিঙ্গল ও ড.ডেভিড ম্যাকব্রাইড একটি নতুন চিকিৎসা নিয়ে আসেন। তাদের ধারণা ছিল টিস্যুতে 'নির্দিষ্ট বায়ু'না থাকাস পারভী রোগ হয় যা মল্ট ও ঔর্ট এর মিশ্রণ পান করে  প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

প্রতিরোধ

 স্কার্ভি চিকিৎসা খুবই সহজ এবং কার্যকরী। মূল চিকিৎসা হলো ভিটামিন সি এর ঘাটতি পূরণ করা। চিকিৎসা শুরু করলে খুব তাড়াতাড়ি উন্নতি হয়। যেমন-
প্রথম ধাপ: ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট( ট্যাবলেট বা ইনজেকশন) দেয়া হয়
প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য: প্রথমে ৫০০- ১০০০ মিলিগ্রাম প্রতিদিন(কয়েকদিন থেকে ১-২সপ্তাহ),তারপর ১০০-৩০০mgপ্রতিদিন কয়েক সপ্তাহ।
শিশুদের জন্য:১০০-৩০০mg প্রতিদিন(বয়স অনুসারে ডাক্তার নির্ধারণ করবেন)

ফলাফল:১-২ দিনের মধ্যে ক্লান্তি, ব্যথা, দুর্বলতা কমে যায়
১-২ সপ্তাহের মধ্যে মাড়ি থেকে রক্তপাত, ত্বকের সমস্যা ভালো হয়
পুরোপুরি সুস্থ হতে ২-৪ সপ্তাহ বা ১-৩ মাস লাগতে পারে
অন্যান্য: রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন সি লেভেল চেক করা যায়। আয়রনের অভাব থাকলে সেটাও চিকিৎসা করতে হয়

সতর্কতা

লক্ষণ দেখলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। অতিরিক্ত ভিটামিন সি( ২০০০mg এর বেশি) খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া(ডায়রিয়া)হতে পারে।আধুনিক সময়ে এই রোগ খুব কম দেখা যায়,কিন্তু অপুষ্টি, অ্যালকোহলিজম বা একঘেয়ে খাদ্যাভাসে  ঝুঁকি থাকে। সবচেয়ে ভালো প্রতিকার সুষম খাদ্যাভাস গড়ে তোলা।
ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপের জন্য বিশেষ সতর্কতা:-
শিশু ও কিশোর: দ্রুত বাড়ছে বলে তাদের চাহিদা বেশি। শুধু দুধ-ভাত-রুটি খেলে অভাব হতে পারে। প্রতিদিন ফল বা সবজি দিন।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা: চাহিদা ১০০- ১২০ মিলিগ্রাম। অভাব হলে মা ও শিশু উভয়ই ঝুঁকিতে পড়বেন।
বয়স্ক ব্যক্তি: দাঁতের সমস্যা বা একা থাকার কারণে ফল-সবজি কম খান। পরিবারের সদস্যরা নজর রাখুন।
ধূমপায়ী ও অ্যালকোহল সেবনকারীর: ধোয়া ও অ্যালকোহল ভিটামিন সি দ্রুত নষ্ট করে। তাদের অন্তত ৩৫ মিলিগ্রাম বেশি লাগে।
দীর্ঘমেয়াদী রোগী: ক্যান্সার, কিডনিস ডায়ালাইসিস,অস্ত্রোপ্রচারের পরে চাহিদা বাড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অস্বাভাবিক ডায়েট অনুসরণকারী: কিছু কঠোর ডায়েটে(যেমন কার্ডভোর ডায়েট) ফল-সবজি বাদ পড়ে যায়, এতে ঝুঁকি বাড়ে।

অভ্যাসগত সর্তকতা:-
  •  ফল-সবজি কেনার সময় তাজা ও পাকা নিন(পচা বা বাসি হলে ভিটামিন কমে যায়)।
  • কাটার পর দ্রুত খান-বাতাসে রাখলে ভিটামিন সি অক্সিডাইজ হয়।
  • রান্নার পানি ফেলে না দিয়ে তরকারি/ঝোল খান-কিছু ভিটামিন পানিতে চলে যায়।
  • সাপ্লিমেন্ট এর উপর অতিরিক্ত নির্ভর করবেন না, প্রাকৃতিক খাবার থেকে পাওয়া ভিটামিন সি শরীর ভালো শোষণ করে।
সামাজিক ও পাবলিক স্তরে সর্তকতা:-
দারিদ্র পীড়িত এলাকায় সচেতনতা বাড়ানো
স্কুলে মিড-ডে মিলে ফল বা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখা
দুর্যোগ বা শরনার্থী শিবিরের ত্রানে লেবু/ভিটামিন সি ট্যাবলেট সরবরাহ

শেষ কথাঃ

স্কার্ভি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধ যোগ্য এবং অত্যন্ত সহজে নিরাময়যোগ্য রোগ। ঐতিহাসিকভাবে সমুদ্র যাত্রীদের মধ্যে মারাত্মক ছিল (১৫-১৮ শতকে লক্ষ লক্ষ নাবিক মারা গিয়েছিল) কিন্তু ১৭৪৭ সালে জেমস লিন্ডের পরিক্ষার পর লেবু-লাইমের রস খাওয়ানো শুরু হলে এটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আজকের দিনে উন্নত দেশগুলোতে এটি খুবই বিরল, কারণ সাধারণ খাদ্যাভাসেই যথেষ্ট ভিটামিন সি পাওয়া যায়।

স্কার্ভি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কিছু রোগের সমাধান অত্যন্ত সরল- শুধু সচেতনতা এবং সুষম খাদ্যাভাসই যথেষ্ট। যদি কারো মাড়ি থেকে রক্তপাত, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ত্বকে সহজে দাগ পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এটি থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া খুবই সহজ।


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url