বেরিবেরি রোগের কারন ও লক্ষন এবং প্রতিকার
সুস্থ্যতাই সকল সুখের মুল
বেরিবেরি একটি গুরুতর পুষ্টিজনিত রোগ, যা মূলত ভিটামিন বি১(থায়ামিন) এর অভাবে হয়ে থাকে। থায়ামিন শরীরের শক্তি উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই ভিটামিনের অভাবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জীবনঘাতী ও হতে পারে যদি সময় মত চিকিৎসা না করা হয়।
আধুনিক যুগে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগ খুব কম দেখা যায়, কারণ খাদ্যে ভিটামিন যোগ করা হয়(ফর্টিফিকেশন)। তবে দরিদ্র অঞ্চলে, অ্যালকোহল আসক্তি বা অন্যান্য কারণে এখনো এটি দেখা যায়। বেরিবেরিকে প্রধানত তিন প্রকারে ভাগ করা হয়।এই রোগের প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা খুব সহজ কিন্তু অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়।
পোস্ট সুচিপত্রঃবেরিবেরি রোগের কারন
- বেরিবেরি রোগের প্রকারভেদ এবং লক্ষণ
- রোগ নির্ণয়
- সতর্কতা
- বেরিবেরি রোগের প্রতিকার এবং চিকিৎসা
- প্রতিরোধ
- শেষ কথা
বেরিবেরি রোগের কারণ
বেরিবেরির প্রধান কারণ হলো-থায়ামিনের অভাব। থায়ামিন একটি জল-দ্রবণীয় ভিটামিন, যা শরীরে সঞ্চিত থাকে না এবং নিয়মিত খাদ্য থেকে গ্রহণ করতে হয়। ঐতিহাসিকভাবে এই রোগটি এশিয়ার দেশগুলোতে বেশি দেখা যেত, বিশেষ করে যেখানে পালিশ করা সাদা চাল প্রধান খাদ্য ছিল। কারণ পালিশ করা চালে খায়ামিনের বাইরের স্তর (ভুসি)সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে এ ভিটামিনের পরিমাণ খুব কম থাকে।
রোগের কারণগুলো নিম্নরূপ, যেমন-
১. খাদ্যাভাসের সমস্যাঃ প্রধানত পালিশ করা সাদা চাল বা পরিশোধিত শস্যজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া। বাদামি চাল বা অপালিস চালে থায়ামিন বেশি থাকে, কিন্তু পালিশ করলে তা নষ্ট হয়ে যায়। দরিদ্র দেশগুলোতে যেখানে খাদ্য তালিকা একঘেয়ে(শুধু চাল বা ময়দা) সেখানে এই সমস্যা বেশি।
২. শ্বসনের সমস্যাঃ পাকস্থলী বা অন্ত্রের রোগ( যেমন গ্যাস্ট্রাইটিস,ক্রোনস ডিজিজ)ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি (ওজন কমানোর অস্ত্রোপচার)ডায়ালাইসিস বা হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণে থায়ামিন শোষিত হয় না।
৩. কিডনি ডায়ালাইসিসঃ(রেনাল ডায়ালাইসিস) দীর্ঘমেয়াদি ডায়ালাইসিস রোগীদের রক্ত থেকে থায়ামিন বের করে ফেলে,যার ফলে অভাব হয়।
- থায়ামিন ছাড়া ডায়ালাইসিস করলে এই ঝুঁকি বাড়ে।
- আধুনিক চিকিৎসায় এটি একটি সাধারণ কারণ, বিশেষ করে কিডনি রোগীদের মধ্যে।
- এটি আধুনিক সময়ে বেরিবেরির একটি নতুন কারণ হিসেবে উঠেএসেছে, বিশেষ করে উন্নত দেশে।
৫. অ্যালকোহলের অত্যাধিক সেবকঃ অ্যালকোহল থাইয়ামিনের শোষণ কমিয়ে দেয় এবং শরীর থেকে তা দ্রুত বের করে দেয়। দীর্ঘদিনের মদ্যপায়ীদের মধ্যে এই রোগ খুব সাধারন।
৬. বর্ধিত চাহিদাঃ গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, জ্বর, সংক্রমণ অত্যাধিক শারীরিক পরিশ্রমের সময় থায়ামিনের চাহিদা বাড়ে। গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়ের অভাব হলে শিশুর মধ্যে শিশুর বেরিবেরি হয়।
৭. জেনেটিক কারণঃ খুব কম ক্ষেত্রে জন্মগত সমস্যায় থায়ামিন শোষণ হয় না।
৮. খাদ্যে থায়ামিন-ধ্বংসকারী উপাদানঃ(এন্টি- থায়ামিন ফ্যাক্টর বা থায়ামিনেজ) কিছু খাবারে থাইয়ামিন এর নামক এনজাইম থাকে, নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
উদাহরণঃ কাঁচা মিঠা পানির মাছ, কাঁচা সেলফিস(ঝিনুক জাতীয়) ফার্ন (এক ধরনের উদ্ভিদ)।
- অন্যান্যঃ চা, কফি,বেটেল নাট(পানের সাথে খাওয়া সুপারি) তেএন্টি-থায়ামিন উপাদান থাকে যা থাইমিনের কার্যকারিতা কমায়।
- প্রক্রিয়াজাত খাবারে সালফাইট(সংরক্ষণকারী রাসায়নিক)থায়ামিন ধ্বংস করে।
- এগুলো নিয়মিত খেলে, এমনকি খাদ্যে থায়ামিন থাকলেও শরীরে অভাব দেখা দিতে পারে। এটি বিশেষ করে কিছু অঞ্চলে(যেমন মাছ-নির্ভর খাদ্যাভাসে) দেখা যায়।
- এটি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের মধ্যে (যেমন ICU-তে)ওয়ার্নিকে এনসেফালোপ্যাথি বাবেরিবেরি ট্রিগার করতে পারে।
- দুর্ভিক্ষ বা চরম অনাহারে এটি দেখা যায়।
১১. অন্যান্য কম সাধারন কারনঃ এইচআইভি/এইডস, ক্যান্সার চিকিৎসা দীর্ঘদিনের অপুষ্টি।
- সালফাইট- যুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের অত্যাধিক সেবন।
- চরম ওজন কমানোর ডায়েট যা famine- এর মত অবস্থা তৈরি করে।
বেরিবেরি রোগের প্রকারভেদ এবং লক্ষন
- পেশী দুর্বলতা, হাঁটুতে অসুবিধা বা পক্ষাঘাত।
- হাত- পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি, অসাড়তা বা ব্যথা।
- রিফ্লেক্স কমে যাওয়া
- মানসিক সমস্যা:বিভ্রান্তি,স্মৃতিভ্রংশ(যা ওয়ার্নিকে এনসেফালোপ্যাথি বা কর্সাকফ সিন্ড্রোমে রুপান্তরিত হতে পারে)।
- চোখের নড়াচাড়া অস্বাভাবিক, কথা বলতে অসুবিধা।তবে এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থায়ী স্নায়ুর ক্ষতি হয়।
- পা ফোলা(এডিমা) তরল জমা।
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট।
- হার্ট ফেলিওর, নিম্ন রক্তচাপ।
- তীব্র ক্ষেত্রে শোশিন বেরিবেরি: দ্রুত হার্ট ফেলিওর, র ল্যাকটিক অ্যাসিডোসিস, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
- কর্কশ কান্না(অ্যাফোনিক ফর্ম)।
- হৃদযন্ত্রের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট,সায়ানোসিস।
- বমি, অস্থিরতা,খিঁচুনি ।
- তীব্র ক্ষেত্রে দ্রুত মৃত্যু।
- সাধারণ লক্ষ্যণ: ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্তি, ওজন কমা, পেটের সমস্যা।
রোগ নির্ণয়ঃ
- অ্যাকুপ্রেশারে বিশ্বাস করা হয় যে শরীরের মেরিডিয়ান (এনার্জি চ্যালেন) দিয়ে জীবনশক্তি(Qi) প্রবাহিত হয়।
- কোন অঙ্গে সমস্যা হলে সেই অঙ্গের সাথে যুক্ত পয়েন্টে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা বাড়ে। এই পয়েন্টে চাপ দিলে তীব্র ব্যথা অনুভব হলে সেই অঙ্গে রোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
- এটি ডায়াগনোস্টিক টুল হিসাবে ব্যবহার হয়, বিশেষ করে হাত ও পায়ের পয়েন্টে(রিফ্লেক্সোলজি বা সুজকের মতো)।
- LI4(হাতের পয়েন্ট-থাম্ব ও ইন্ডেক্স ফিঙ্গারের মাঝে): মাথাব্যথা, দাঁতের ব্যথা বা সাধারণ ব্যথা নির্ণয় ব্যবহৃত। চাপ দিলে তীব্র ব্যথা হলে হেডেক বা ডাইজেস্টিভ সমস্যা হতে পারে।
- P6(কব্জির ভিতরে, ৩ আঙ্গুল দূরে): বমি বমি ভাব,নাউজিয়া বা হার্টের সমস্যা সনাক্ত করতে।
- হাতের তালুতে লিভার/হার্ট জোন: লিভারের সমস্যা হলে এখানে ব্যথা হয়।
- পায়ের তালুতে রিফ্লেক্স পয়েন্ট: কিডনি, থাইরয়েড, লিভার ইত্যাদি অঙ্গের জন আছে ব্যথা হলে সেই অঙ্গের রোগের ইঙ্গিত।
- তীব্র ব্যথা= অঙ্গে সমস্যা।
- হালকা ব্যথা= শুরুর পর্যায়।
- কোন ব্যথা না= সুস্থ।
সতর্কতা
- এটি একটি বিকল্প থেরাপি, বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। এটি শুধুমাত্র লক্ষণ সনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তারের কাছে যান এবং রক্ত পরীক্ষা,এক্স-রে ইত্যাদি করান।
- গুরুতর রোগ(যেমন ডায়াবেটিস,হার্ট, কিডনি) হলে শুধু অ্যাকুপ্রেশারের এর উপর ভরসা করবেন না।
- প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের কাছ থেকে শিখে নিন, নিজে চাপ দিলে ভুল হতে পারে।
বেরিবেরি রোগের প্রতিকার এবং চিকিৎসা
- থায়ামিন সাপ্লিমেন্টশন: গুরুতর ক্ষেত্রে(যেমন ভেজা বেরিবেরি বা শোশিন বেরিবেরি,যা হঠাৎ হার্ট ফেলিয়র সৃস্টি করে)।প্রথমে ইন্ট্রাভেনাস (শিরাপথে) থায়ামিন ইনজেকশন দেওয়া হয়।
- ডোজ: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০০- ৩০০ মিলিগ্রাম দৈনিক(কয়েক সপ্তাহ)।তারপর ওরাল(মুখে খাওয়া)চালিয়ে যাওয়া।
- হালকা ক্ষেত্রে: মুখে থায়ামিন ট্যাবলেট, ৫-১০ মিলিগ্রাম দিনে ৩ বার (বয়স্কদের জন্য)।
- খাদ্য পরিবর্তন : থায়ামিন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করা।
- ভেজা বেরিবেরিতে হার্টের সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত সাপোর্টিভ চিকিৎসা(যেমন অক্সিজেন,ডাইইউরেটিকস) দেওয়া হয়। তীব্র ক্ষেত্রে IV থায়ামিন দিয়ে ১২-২৪ ঘন্টায় উন্নতি দেখা যায়।
- শুস্ক বেরিবেরিতে স্নায়ুর ক্ষতিপূরণ হতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস লাগতে পারে।
- অন্যান্য চিকিৎসা: অন্তর্নিহিত কারণ(যেমন- অ্যালকোহল আসক্তি,ম্যালঅ্যাবজর্পশন) চিহ্নিত করে তার চিকিৎসা।
- রক্ত পরীক্ষায় থায়ামিন লেভেল চেক করে উন্নতি মনিটর করা।
- চিকিৎসা না করলে রোগ মারাত্মক হতে পারে(হার্ট ফেলিয়র বা স্থায়ী স্নায়ু ক্ষতি)। সময় মতো চিকিৎসায় পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব। চিকিৎসায় বেশিরভাগ লক্ষণ সেরে যায়, কিন্তু দেরি হলে স্থায়ী ক্ষতি(যেমন স্মৃতিভ্রংশ) হতে পারে।
প্রতিরোধ
- সুষমখাদ্য:পূর্ণশস্য,বাদামীচাল,ডাল,বাদাম,মুরগি,মাছ,মাংস,দু্ধ,ডিম,সূর্যমুখীবীজ,সবুজ শাকসবজি,আলু(যেমন- ফুলকপি, পালং শাক)।
- খাদ্য ফর্টিফিকেশন: অনেক দেশে চাল বা ময়দায় থাইমিন যোগ করা হয়।
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিন।
- অ্যালকোহল সীমিত করুন।
- ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য: অ্যালকোহল সেবন কারীদের অ্যালকোহল কমানো বা ছাড়া।
- উন্নয়নশীল দেশে চালের খোসা না ছাড়িয়ে( বাদামি চাল )খাওয়া।
- গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েরা থায়ামিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খান(শিশুর বেরিবেরি প্রতিরোধে)।
- দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, গ্যাস্ট্রিক সার্জারি বা ক্রনিক রোগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিন।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url