ঢাকাই জামদানি শাড়ির ইতিহাস
সকালে কালিজিরা খাওয়া ভালো
ঢাকাই জামদানি শাড়ি বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতবয়নের এক অমূল্য সম্পদ, যা বিশ্বব্যাপী তার অতুলনীয় সূক্ষ্ণতা, জটিল নকশা এবং স্বচ্ছতার জন্য খ্যাত। জামদানি শাড়ির ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, যা প্রাচীন ভারতীয় তাঁত শিল্পের সাথে যুক্ত। এই শাড়িটি কেবল একটি পোশাক নয় বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতীক।
এর উৎপত্তি ঢাকার নারায়ণগঞ্জ এলাকায়, যেখানে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কারিগররা এই কাজ করে চলেছেন।জামদানি শব্দটি ফারসি থেকে এসেছে-'জাম'মানে পোশাক এবং 'দানি' মানে সূক্ষ্ম বা জটিল। এটি মুসলিমের এক বিশেষ ধরণ,যা হাতে বোনা এবং নকশা যোগ করার প্রক্রিয়ায় অসাধারণ দক্ষতা প্রয়োজন।
পোস্ট সূচীপত্রঃ ঢাকাই জামদানি শাড়ির উদ্ভব এবং প্রাচীন ইতিহাস
- মুঘল যুগের উন্নয়ন এবং স্বর্ণযুগ
- ব্রিটিশ ওপনিবেশিক আমল এবং পতন
- স্বাধীনতা উত্তর যুগের পুনরুদ্ধ জীবন এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জ
- বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি
- আধুনিক ব্যবহার এবং বৈচিত্র
- শিল্প কর্মের বৈশিষ্ট্য
- সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
- শেষ কথা
ঢাকাই জামদানি শাড়ির উদ্ভব এবং প্রাচীন ইতিহাস
জামদানি শাড়ির ইতিহাসকে অনুসন্ধান করলে আমরা পৌঁছায় প্রায় ১ম খ্রিস্টাব্দে । এই লেখায় আমরা জামদানি শাড়ির ইতিহাসকে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব- এর উদ্ভব থেকে মুঘল যুগের উন্নয়ন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে পতন, স্বাধীনতার পর পুনরূজ্জীবন এবং আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা।এই ইতিহাসের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারবো কিভাবে এই শাড়ি বাংলার অর্থনীতি, সমাজ এবং সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান লেখকরা ভারতীয় মুসলিমের উল্লেখ করেছেন, যা'ওয়েবস অফ ওয়ান্ডার' নামে পরিচিত ছিল।প্লিনি দ্য এল্ডারের লেখায় বর্ণিত'গ্যাঙ্গেটিক মসলিন' সম্ভবত এই জামদানিরই পূর্বসূরী। বাংলার সুমসুম মাটি এবং আর্দ্র জলবায়ু এই সূক্ষ্ণ সুতোর উৎপাদনের জন্য আদর্শ ছিল। প্রথমে এটি ছিল সাধারণ মুসলিম কিন্তু ৫ম শতাব্দীতে গুপ্তযুগে নকশা যোগ করার কৌশল বিকশিত হয়।বাংলার পালা রাজবংশ(৮ম-১২শতাব্দী) এবং সেন রাজবংশের আমলে তাঁত শিল্প ফুলে কেঁপে ওঠে।
ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জ এবং সোনারগাঁও এলাকায় তাঁত কারখানা গড়ে ওঠে। এখানকার কারিগররা 'ফাইন কটন' ব্যবহার করে শাড়ি বোনতেন,যা এত সূক্ষ্ণ যে এটি বাতাসের মতো হালকা। প্রাচীন বাণিজ্যপথের মাধ্যমে এই শাড়ির আরব, পারস্য এবং ইউরোপে পৌঁছাত। চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন( ৫ম শতাব্দী) এবং আরব বণিক আল-বিরূনি( ১১শ শতাব্দী )এর সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন।১৩শ শতাব্দীতে দিল্লি সুলতানের আমলে মুসলিম শাসকরা ফারসি নকশা যোগ করেন।
যেমন- পাখি, ফুল এবং জ্যামিতিক প্যাটার্ন। এতে জামদানির আকৃতি নেয় একটি হাইব্রিড ফার্ম- ভারতীয় সূক্ষ্ণতা এবং ইসলামী নকশার মিশ্রণ। ঢাকা নগরীর নামকরণও এই তাঁত শিল্পের সাথে যুক্ত; 'ঢাকা' শব্দটি সম্ভবত 'ঢাকাই কাপড়' থেক উদ্ভত। এই যুগে জামদানি শাড়ি রাজ পরিবারের পোশাক হয়ে ওঠে এবং এর উৎপাদন বাংলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
মুঘল যুগে উন্নয়ন এবং স্বর্ণযুগ
মুঘল সাম্রাজ্যের আগমন(১৬শ শতাব্দী) জামদানি শাড়ির ইতিহাসে একটি স্বর্ণযুগের সূচনা করে। সম্রাট আকবর( ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫) বাংলাকে তাঁত শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন।তাঁর আমলে ঢাকার তাঁত কারখানায় হাজারো কারিগর কাজ করতেন এবং জামদানিকে 'ফিগার্ড মুসলিম অফ ঢাকা' নাম দেয়া হয়। আকবরের স্ত্রী জোধাবাঈ এবং অন্যান্য বেগমরা এই শাড়ি পরিধান করতেন। যা রাজকীয় দরবারের অংশ হয়ে ওঠে। মুঘল শাসকরা জামদানির উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় স্তরে উন্নীত করেন।
সম্রাট শাহজাহান( ১৬২৮ থেকে ১৬৫৮) এর আমলে এটি আগ্রা এবং দিল্লির দরবারে পাঠানো হতো।ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুসারে,১৭শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় কোম্পানি যেমন ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জামদানি আমদানি করতো। ফরাসি ভ্রমণকারী ফ্রাসোয়া বার্নিয়ে(১৬৬৮) লিখেছেন" ঢাকার মুসলিম এত সূক্ষ্ণ যেএটি দেহের উপর রাখলে ছায়ার মত মনে হয়।" এ যুগের জামদানির বোনার কৌশল পরিপূর্ণ হয়- হাতে বোনা তাতে' জ্বালা' মোটিভ যোগ করা হতো।
যা একই সাথে বোনা এবং কাঁচির কাজের মিশ্রণ। ১৮শ শতাব্দীতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত জামদানি বাংলা রপ্তানির ৮০% অংশ দখল করে। নওয়াবদের আমলে ঢাকা একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং শাড়ির দাম এত উঁচু যে একটি জামদানি শাড়ির দাম একটি গ্রামের সমান ছিল। এই যুগে নকশাগুলো আরো জটিল হয়-'পাঞ্চ ফুল','তেরছা'এবং'বুটি' মোটিফগুলো জনপ্রিয় হয়।মহিলা কারিগররা এতে অংশ নিতেন, যা বাঙালি সমাজের লৈঙ্গিক ভূমিকা কে প্রভাবিত করে।
আবুল ফজল তার আইন-ই আকবরীতে লিখেছেন- ঢাকার মুসলিম এত সূক্ষ্ণ যে একটি পুরো শাড়ি একটি ছোট বাক্সে বা আংটির ভিতর দিয়েও যায়। জাহাঙ্গীর- নুরজাহানের আমলে" জাল" (জালের মত পাতলা) ও "তরবারি" ডিজাইনের জামদানি তৈরি হতো।তাঁতিরা ফুলের পাপডি, পাখি, ময়ূর,লতা-পাতা বুনতেন হাতে । মোটামুটি, মুগল যুগ জামদানিকে বিশ্বমানের একটি পণ্যে পরিণত করে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল এবং পতন
১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন জামদানি জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসেএবং শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের যন্ত্র ভিত্তিক কাপড় বাজারে প্রবেশ করে। ১৭৫৭-এর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুসলিম শিল্পকে ধ্বংস করতে শুরু করে।
তাঁতিদের আঙ্গুল কেটে দেয়ার গল্প প্রচলিতিদের(যদিও কিছুটা অতি রঞ্জিত)।১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে ভারতীয় তাঁত শিল্পের উপর শুল্ক আরোপ করা হয়, যা জামদানির রপ্তানি ধ্বংস করে।১৮১৭ সাল নাগাদ ঢাকার মুসলিম বাজার প্রায় শেষ। ম্যানচেস্টারের মিলের সস্তা কাপড় বাংলার বাজার দখল করে নেয়।১৮২০-এর দশকে মুসলিম উৎপাদন ৯০% কমে যায়।
কারিগররা দারিদ্র্যের মুখোমুখি হন, অনেকে চাষাবাদে ফিরে যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা' উপন্যাসে এই পতনের চিহ্ন ফুটে ওঠে। তবে কিছু কারিগর গোপনে কাজ চালিয়ে যান। বিশেষ করে গ্রামীন এলাকা গুলোতে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জামদানিকে স্বদেশী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা সামান্য পুনরুদ্ধ জীবন ঘটায়। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকটে এটি আবার সংকুচিত হয়। এই যুগ জামদানির ঐতিহ্যকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয় কিন্তু এর মাধ্যমে বাঙালির প্রতিরোধ চেতনা আরো বেশি জাগ্রত হয়।
ড্যাডাবাই নওরোজি লিখেছেন," ব্রিটিশ নীতি ভারতীয় হস্তশিল্পকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশ্চিহ্ন করেছে"।১৯শ শতাব্দীতে ঢাকার তাঁত কারখানা বন্ধ হতে থাকে।আর এই ১৯শ শতাব্দীর দিকে আসল ঢাকাই জামদানি শাড়ি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।১৯৩০-এর দশক থেকে বিলেতি- জাপানি সুতা আসার পর স্থানীয় ফুঁটি কর্পাস তুলা চাষ বন্ধ; আজকের জামদানি সর্বোচ্চ ১২০ কাউন্টে বোনা হয়,তবে পরে মুঘল আমলে ৪০০ কাউন্ট পর্যন্ত যেত।
স্বাধীনতা-উত্তর যুগে পুনরুজ্জীবন এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জ
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের পর পূর্ব পাকিস্তানট( বর্তমান বাংলাদেশ) জামদানির ঐতিহ্য রক্ষা করে।১৯৫০-এর দশকে সরকারি উদ্যোগে তাঁত কারখানা পুনরায় চালু হয়। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এটি জাতীয় প্রতীক হয়ে ওঠে।২০০৫সাল-থেকে তুলা রেশম মিশ্রিত" হাইব্রিড জামদানি" চালু; ঐতিহ্যবাহী তাঁতিরা তিরা" ভেজাল" বলেন কিন্তু বাজারে এটির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০০৮ সালে ঢাকাই জামদানি শাড়িকে ইউনেস্কোর অস্পর্শযোগ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা স্থান দেওয়া হয়, যা বিশ্বব্যাপি স্বীকৃতি দেয়।
আধুনিক যুগের জামদানি উৎপাদন নারায়ণগঞ্জ ঢাকা এবং সিলেটে কেন্দ্রিভূত। এখন হাজারো কারিগর, বিশেষ করে মহিলা, এতে নিয়োজিত। সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ হস্তশিল্প নিয়ন্ত্রক বোর্ড (BHTC)এবংNGOযেমন-BRAC প্রশিক্ষণ প্রদান করে। বাজারের জামদানি দাম ৫০০০ থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।
এটি বিদেশে রপ্তানি হয়। তবে, চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সস্তা মেশিনমেড কাপড়ের প্রতিযোগিতা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুতোর গুণগত মান হ্রাস। সাংস্কৃতিক ভাবে, জামদানি বাঙালি মহিলাদের পরিচয়ের অংশ। এটি বিয়ে, উৎসব এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পরিধান করা হয়। ডিজাইনাররা আধুনিক টুইস্ট যোগ করেছেন, যেমন জ্যামিতিক প্যাটার্ন সাথে সমসাময়িক কালার। ভবিষ্যতে টেকসই উৎপাদন এবং ডিজিটাল মার্কেটিং এর সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি
২০১৩ সালে ইউনেস্কো জামদানি বোনাকে 'মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যা এর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ এর জন্য ভৌগোলিক সূচক জি আই(Geographical Indication)পায় যা প্রথম দেশীয় পণ্য। ফ্যাশন শোতে এটি হাইলাইট হয় এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এর ব্যবহার করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মাস্টার বোনাকারী বীরেন কুমার বসাককে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেয়া হয়েছ।আজ প্যারিস-লন্ডনের ফ্যাশন হাউজ থেকে শুরু করে হলিউডের রেড কার্পেট সবখানেই ঢাকাই জামদানি দেখা যায়।
আধুনিক ব্যবহার এবং বৈচিত্র্য
আজকের দিনে জামদানি শুধু শাড়ি নয়,স্কার্ফ,হ্যান্ডকার্চিফ এবং আধুনিক পোশাকেও ব্যবহৃত হয়। ডিজাইনেররা ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমকালীন টুইস্ট যোগ করেছেন, যেমন তারিনা সেনের 'টারিনা'ব্র্যান্ড যা তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করে। জামদানি ফেস্টিভ্যাল অফ ওয়্যারেবল আর্টের মতো প্রদর্শনীতে টেকসই উৎপাদিত শাড়ি গুলো দেখানো হয়।
প্রতিষ্ঠান যেমন রেডিয়েন্ট ইন্সটিটিউট অফ ডিজাইন নতুন ডিজাইন তৈরিতে সাহায্য করছে।মধ্যস্থতাকারী এড়িয়ে সরকারি-বোনাকীদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। এভাবেই শিল্প নতুন বাজারে পৌঁছাচ্ছে। জামদানি শাড়ি বাংলার সৃজনশীলতা এবং ঐতিহ্য জীবন্ত উদাহরণ যা আজও বিশ্বকে মুগ্ধ করে। এর মাধ্যমে শিল্পীরা তাদের পরিচয় রক্ষা করছেন।
শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য
জামদানি শিল্পকর্মের শীর্ষস্থানীয় উদাহরণ, যা বাংলাদেশি বোনা কারীদের সৃজনশীলতার প্রমাণ।এটি হাতে বোনা হওয়ায় প্রতিটি টুকরোতে ব্যক্তিগত ছোঁয়া থাকে-কোনো দুটি একই নয়। উপকরণ হিসেবে সূক্ষ্ণ তুলো (মসলিন) ব্যবহার হয়, যা হালকা এবং আরামদায়ক। কখনো সোনার সুতো মিশিয়ে ব্রোকেড ইফেক্ট দেওয়া হয়।
বোনা প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে এটি ঢাকার লুমের সবচেয়ে দামি পণ্য।মাস্টার বোনাকারীরা ঐতিহ্যবাহী মোটিভ রক্ষা করেন। এবংচেলা-শিষ্য ব্যবস্থায় জ্ঞান হস্তান্তরিত হয়। এই শিল্পে সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধতা দেখা যায়, যেখানে স্পিনার,ডাইয়ার এবংলুম-সেটাররা একসাথে কাজ করেন।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
জামদানি শাড়ি বাঙ্গালী নারীদের পরিচয়, মর্যাদা এবং আত্মসম্মানের প্রতীক। এটি পরিধান করে সংস্কৃতিক ঐক্য অনুভূত হয়, বিশেষ করে বাড়িতে এবং প্রবাসে। বোনা কারীরা তাদের পেশায় গর্বিত এবং সমাজে তাঁতি দক্ষতা সম্মানিত। জামদানি শুধু পোশাক নয়, বাঙালির পরিচয়। পহেলা বৈশাখে, বিয়েতে, ঈদে- জামদানি ছাড়া উৎসব যেন অসম্পূর্ণ।
এটি বাংলার নারীর গর্ব, সৌন্দর্য আর সূক্ষ্ণ রুচির প্রতীক।গানে- কবিতায়-চলচ্চিত্রে জামদানি বারবার ফিরে আসে। ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া-বাউল গানে জামদানির উল্লেখ প্রচুর,তাঁতের ছন্দ ও ভাটিয়ালি তাল একই তাঁতিরা গান গাইতে গাইতে বুনতেন যাতে মনোযোগ না ভাঙে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-"তোমার পাতা আমার গায়ে লাগে, শীতল শিশিরের মত"।সত্যজিৎ রায়ের 'দেবী' ছবিতে চৌধুরানীর গায়ে জামদানি শাড়ি বাঙালিয়ানার চূড়ান্ত রূপ।
শেষ কথাঃ
ঢাকাই জামদানি কোন সাধারণ কাপড় নয়,এ যেন বাংলার নদী -মাটি আর্দ্র বাতাস আর মানুষের শত শত বছরের ধৈর্যের এক জীবন্ত কবিতা। একটি ছয় গজ কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে হিউয়েন সাং-এর বিস্ময়,মুঘল বাদশাহের গর্ব, নারী তাঁতের আঙ্গুলের জাদু, ভাটিয়ালি গানের সুর আর স্বাধীনতা-পর্ব বাংলার সুক্ষ্ণতম স্বপ্ন। আজ যখন পাওয়ারলুমের জাল শাড়ি আর হাইব্রিড রেশন-তুলার ঝলমলে প্রতিযোগিতা খাঁটি জামদানি হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে দাঁড়িয়ে, তখনো নরসিংদী- রূপগঞ্জের অন্ধকার ঘরে একজন বুড়ি তাঁতি গান গাইতে গাইতে ১২০ কাউন্টের সুতায় পাপড়ি ফুটিয়ে চলেছেন।
তাঁর আঙ্গুলের ছোঁয়ায় জেগে উঠে ফুল,পাখি,ময়ূর,জ্যামিতিক স্বপ্ন-যা কোন মেশিন কখনো বুনতে পারবে না। জামদানি শুধু পরার জিনিস নয়, এ বাংলার পরিচয়। এ যে সেই শেষ জীবন্ত ঐতিহ্য, যে ঐতিহ্যের প্রতিটি বুটিতে শোনা যায় আমাদের পূর্বপুরুষের নিঃশ্বাস। যতদিন একজন তাঁতি ও থাকবেন, যতদিন একটি মেয়ে বিয়ের দিন লাল বর্ডারে জামদানি পরে মায়ের কাছে আশীর্বাদ নেবেন, যতদিন বিদেশের রানওয়েতে জামদানি গাউন হেঁটে বেড়াব, ততদিন বাংলার আত্মা অমর থাকবে।
তাই আসু্ন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি-এই সূক্ষ্ণ সুতোর জাল যেন কখনো ছিড়ে না যায়। কারণ জামদানি বাঁচলে বাঁচে বাংলার শিল্প, বাঁচে আমাদের গর্ব,বাঁচে আমাদের পরিচয়। একটি জামদানি কিনে আমরা কেবল শাড়ি কিনিনা, বাঁচিয়ে রাখি একটি জাতির হাজার বছরের স্বপ্ন।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url