সোয়াইন ফ্লু কোন ভাইরাসের কারনে হয় লক্ষণ এবংপ্রতিকার
ব্যয়াম করা শরীরের জন্য খুব ভালো
সোয়াইন ফ্লু বা H1N1 ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ইতিহাস খুবই আকর্ষণীয় এবং জটিল। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী মহামারি(প্যান্ডেমিক) হিসেবে আবির্ভূত হয়, ২১শ শতাব্দীর প্রথম ইনফ্লুয়েঞ্জা পান্ডেমিক। কিন্তু এর শিকড় অনেক পুরনো-এমনকি ১৯১৮ সালের কুখ্যাত" স্প্যানিশ ফ্ল" পান্ডেমিকের সাথে যুক্ত।
সোয়াইন ফ্লু হাঁচিকাশিবা দূষিত জিনিস স্পর্শ করার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়, যার প্রধান লক্ষণগুলো হলো জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা ও শরীর ব্যথা, প্রতিকার হিসেবে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ(যেমন ওসেল্টামিভির) সেবন এবং প্রতিরোধে টিকা ও স্বাস্থ্যবিধি জরুরি।
পোস্ট সূচীপত্রঃ সোয়াইন স্লো কোন ভাইরাসের কারণে হয়
- উৎপত্তি এবং ভাইরাসের বিবর্তন
- ২০০৯ সালের মহামারীর শুরু এবং ছড়িয়ে পড়া
- ছড়িয়ে পড়ার কারণ
- লক্ষণসমূহ
- রোগ নির্ণয় ও সোয়াইন ফ্লোর কি কোন টিকা আছে
- চিকিৎসা
- সোয়াইন ফ্লোর ঘরোয়া প্রতিকার এবং নিজের যত্ন
- শেষ কথা
সোয়াইন ফ্লু কোন ভাইরাসের কারণে হয়
- সোয়াইন ফ্লকে সাধারণত H1N1 influenza virusবাA(H1N1) দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
- এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা A টাইপের ভাইরাস, যা প্রথমে শুকরের মধ্যে দেখা যেত। ২০০৯ সালের বিশ্বকাপে মহামারীতে এই ভাইরাসটি নামেও পরিচিত মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে
- ভাইরাসের নামের H1N1 অংশটি আসে ভাইরাসের পৃষ্ঠের দুটি প্রোটিন থেকে:Hemagglutinin (H1)এবংNeuraminidase (N1)।
- শূকরে এ ভাইরাসের অন্যান্য সাবটাই ও থাকে যেমন H3N2বাH1N1, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে সোয়াইন ফ্লু সবচেয়ে বেশি পরিচিত এবং মহামারী ঘটিয়েছে, সেটি হল H1N1।
- বর্তমানে এইH1N1 ভাইরাস মৌসুমী ফ্লোর একটি অংশ হয়ে গেছে এবং সাধারণ ফ্লু ভ্যাকসিনে এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা থাকে।
উৎপত্তি এবং ভাইরাসের বিবর্তন
১. ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে শুরু:H1N1 ভাইরাসের মূল উৎস পাখি(avian origin) থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ১৯১৮-১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু পান্ডেমিকে এই ভাইরাস মানুষ এবং শুকর উভয়কেই আক্রান্ত করে। এটি বিশ্বে ৫০-১০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এরপর ভাইরাসটি শুকরদের মধ্যে" ক্লাসিক্যাল সোয়াইন H1N1" হিসেবে স্থায়ী হয়ে যায়।
২. ১৯৯০-এর দশকে রি-অ্যাসর্ট্মেন্ট: উত্তর আমেরিকার শুকরদের মধ্যে তিনটি ভিন্ন ফ্ল ভাইরাসের জিন মিশে "ট্রিপল রি-অ্যাসর্ট্যান্ট"ভাইরাস তৈরি হয়-পাখি,শূকরএবং মানুষের ফ্লু থেকে। এছাড়া ইউরেশিয়ান শুকরের ফ্ল পুরো ভাইরাস ও মিশে যায়।
৩.২০০৮-২০০৯ সালে নতুন স্ট্রেনের উদ্ভব: গবেষণা(CDC,WHOএবংScience জার্নাল) অনুসারে, এই নতুনH1N1 ভাইরাস মেক্সিকোর মধ্যাঞ্চলীয় একটি ছোট অঞ্চলের শূকরদের মধ্যে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি সময়ে উদ্ভূত হয়। এটি চারটি ভিন্ন লাইনেজের জিনের মিশ্রণ: উত্তর আমেরিকান ট্রিপল রি-অ্যাসর্ট্যান্ট, ক্লাসিক্যাল সোয়াইন, ইউরেশিয়ান সোয়াইন এবংঅ্যাভিয়ান। এর ফলে ভাইরাসটি মানুষে সহজে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা লাভ করে।
২০০৯ সালের মহামারীর শুরু এবং ছড়িয়ে পড়া
- প্রথম কেস: ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে মেক্সিকোর ভেরাক্রূজ প্রদেশের লা গ্লোরিয়া গ্রামে প্রথম আউটব্রেক দেখা যায়। একটি ছোট ছেলেকে" পেসেন্ট জিরো" বলে মনে করা হয়। ৫ বছরের একটি ছেলে এডগান হার্নান্দেজ, যার অসুস্থতা মার্চ ২০০৯-এ সনাক্ত হয়। সে সুস্থ হয়ে যায়, কিন্তু এটি প্রথম নথিভুক্ত মানব সংক্রমণ।
- এপ্রিলে মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রে (ক্যালিফোর্নিয়া) ল্যাবে নিশ্চিত হয় যে এটি একটি নতুন সোয়াইন- অরিজিন H1N1 ভাইরাস। এপ্রিল ২০০৯ এ ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি শিশুর মধ্যে ভাইরাসটি সনাক্ত হয় যা-CDC(Centers for Disease Control and Prevention)নিশ্চিত করে।
- মেক্সিকোতে দ্রুত ছড়ানো: মার্চ-এপ্রিলে মেক্সিকো সিটি এবং অন্যান্য অঞ্চলে হাজার হাজার কেস দেখা যায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি মেক্সিকোতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
- দ্রুত ছড়িয়ে পড়া: বিমান ভ্রমণের কারণে ভাইরাসটি অভূতপূর্ব গতিতে ছড়ায়। জুন ২০০৯ এ WHO পান্ডেমিক লেভেল ৬ ঘোষণা করে( সর্বোচ্চ স্তর)।জুন ১১,২০০৯ WHO পান্ডেমিক অ্যালার্ট লেভেল ৬ ঘোষণা করে (পূর্ণ মহামারি )।ততদিনে ৭৪ টি দেশে ল্যাব-নিশ্চিত কেস ছিল।
- আগস্ট ১০, ২০১০:WHO মহামারী শেষ ঘোষণা করে। ভাইরাসটি এখনো সিজিনাল ফু হিসেবে সার্কুলেট করে। মেক্সিকো সিটিতে স্কুল,থিয়েটার ইত্যাদি বন্ধ করা হয়। ভাইরাসটির নতুন ট্রেন হয় মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল, বিশেষ করে যুবক এবং শিশুদের মধ্যে ।
- মে ২০০৯: ইউরো(প স্পেন), এশিয়া এবং অন্যান্য দেশে কে সনাক্ত হয়। বাংলাদেশে প্রথম কেস জুন ২০০৯ এ( যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত এক যুবক)।
- জুলাই-আগস্ট ২০০৯: উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালেও সংক্রমণ বাড়ে(সাধারণ ফ্লু শীতকালে বাড়ে।)। দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকালে তীব্র পাদুর্ভাব।
- ২০০৯-এর শেষ থেকে ২০১০: দ্বিতীয় ওয়েব আসে, কিন্তু ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে যাওয়ায় নিয়ন্ত্রণে আসে।
ছড়িয়ে পড়ার কারণ
- উড়োজাহাজ ভ্রমণ: আধুনিক যাতায়াতের কারনে ভাইরাসটি অভূতপূর্ব গতিতে বিশ্বজুড়ে ছড়ায়।
- উচ্চ সংক্রামকতা: ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি সংক্রমণ( কাশি,হাঁচি দিয়ে) খুব সহজে হয়।
- যুবকদের বেশি আক্রান্ত: বয়স্কদের মধ্যে পুরনো H1N1-এর প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকায় তারা কম আক্রান্ত হয়।
- ল্যাব-নিশ্চিত কেস: প্রায় এক মিলিয়নের বেশি।
- অনুমানিক সংক্রমণ: বিশ্বের ১১-২১% জনসংখ্যা(৭০০ মিলিয়ন থেকে ১.৪ বিলিয়ন)।
- মৃত্যু:WHO-এর অনুমানে ১৫০,০০০ থেকে ৫৭৫,০০০(অধিকাংশ যুবক)। তবে এই মহামারী থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে ভ্যাকসিন দ্রুত তৈরি এবং সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে।
লক্ষণসমূহ
- শুকনো কাশি (কফ সহ)।
- উচ্চ জ্বর (সাধারনত ১০০ ডিগ্রি F বা তার বেশি, হঠাৎ করে শুরু হয়) এবং ঠান্ডা লাগা (chills বা rigors)।
- গলা ব্যথা (sore throat)।
- নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ (runny or stuffy nose,rhinorrhea)।
- শরীরে ব্যথা,মাংসপেশিও জয়েন্ট (muscle aches বা myalgia)।
- মাথাব্যথা (severe headache)।
- ঠান্ডা লাগা এবং কাঁপুনি
- অত্যধিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা (fatigue বা weakness)।
- ক্ষুধামন্দ্য (loss of appetite)।
- কখনো বমি বা ডায়রিয়া ,( vomiting and diarrhea)-এটি সাধারণ ফ্লুর চেয়ে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে
- শ্বাসকষ্ট বা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট(shorttness of breath)যদি দেখা যায় তাহলে গুরুতর।
- অন্যান্য: চোখ লাল হওয়া, চোখে জালা ইত্যাদি( কম সাধারণ)।
- বুকে বা পেটে তীব্র ব্যথা
- শ্বাস নিতে খুব কষ্ট
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা বিভ্রান্তি
- অতিরিক্ত বমি
- শিশুদের ক্ষেত্রে: দ্রুত শ্বাস, তরল কম খাওয়া, জ্বরের সাথে খিচুনি, অসাড় হয়ে পড়া ইত্যাদি।
রোগ নির্ণয় ও সোয়াইন ফ্লোর কি কোন টিকে আছে?
চিকিৎসা
- ওসেলটামিভির (টামিফ্ল)
- জানামিভির (রেলেঞ্জা)
- পেরামিভির (র্যাপিভাব)
- বালোক্সাভির (জোফ্লজা)
সোয়ান ফ্লোর ঘরোয়া প্রতিকার এবং নিজের যত্ন
- বিশ্রাম নিন।
- জলয়োজিত থাকার :পানিশূন্যতা রোধ করতে প্রচুর তরল পানি,জুস এবং উষ্ণ স্যুপ পান করুন।
- ব্যাথা ব্যবস্থাপনা: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসারে, জ্বর কমাতে এবং শরীরের ব্যথা কমাতে অ্যাসিটামিনোফেন (টাইলেনল) বা আইবুপ্রোফেন (অ্যাডভিল)ব্যবহার করুন।
- হাত স্বাস্থ্যবিধি: সংক্রমনের বিস্তার রোধ করতে, বিশেষ করে কাশি বা হাঁচির পরে, ঘন ঘন হেন্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। আপনার ফোন এবং ট্যাবলেটগুলি জীবাণুমুক্ত করুন, কারণ ভাইরাসগুলি এই পৃষ্ঠগুলিতে বাস করতে পারে।
- কাশি শিষ্টাচার: হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় আপনার নাক এবং মুখ টিস্যু দিয়ে ঢেকে রাখুন।
- আপনার ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করুন: সামগ্রিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ফলমূল, শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন এবং খাদ্য গ্রহণ করুন। পর্যাপ্ত ঘুম পান, কারণ শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতার জন্য বিশ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন: ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে কাজ বা স্কুল এড়িয়ে বাড়িতে থাকুন এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ সীমিত করুন।
- অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ:Oseltamivir (tamiflu)Zanamivir(Relenza)- লক্ষণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করলে সবচেয়ে কার্যকর। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে অক্সিজেন বা অন্যান্য সাপোর্ট।
- বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিন নিন( H1N1অন্তর্ভুক্ত)।
- হাত নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিন(কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড)।
- হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু বা কোনই দিয়ে মুখ ঢাকুন।
- মার্ক্স করুন ঘনিষ্ঠ স্থানে।
- অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়ান।
- চোখ-নাক-মুখ স্পর্শ করবেন না।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url